জাতীয়

কমে যাওয়া বন্দুকযুদ্ধ কি আবার বাড়ছে

(Last Updated On: জুলাই ৩১, ২০২১)

কক্সবাজারে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই নিহত হন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহা মো. রাশেদ খান। পুলিশের গুলিতে নিহত হলেও সেই হত্যাকাণ্ডকে কথিত বন্দুকযুদ্ধের নাট্যরূপ দেওয়ার চেষ্টা চলে। সারাদেশে প্রতিবাদের মুখে অবশ্য তা আর ধোপে টেকেনি। শুধু তাই নয়, আলোচিত এ হত্যার পর প্রায় থেমে যায় কথিত বন্দুকযুদ্ধের চিত্র। পরের পাঁচ মাসে এমন ঘটনার সংখ্যা কেবল পাঁচটি। অথচ আগের ছয় মাসেই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন ১৭১ জন। আর তার আগের বছর ২০১৯ সালে সারাদেশে ৩৮৮ জন নিহত হন। ২০২১ সালেও কথিত এ বন্দুকযুদ্ধের প্রবণতা খুব বেশি জোরালো করা না হলেও ধীরে ধীরে যেন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে অন্তত ২৩টি এমন ঘটনা ঘটেছে, যা কিনা সিনহা হত্যাকাণ্ডের প্রথম পাঁচ মাসের চেয়ে প্রায় পাঁচগুণ। মানবাধিকারকর্মীরা অবশ্য বলছেন, কথিত এসব বন্ধুকযুদ্ধের বিষয়ে সংখ্যা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে আসার সুযোগ নেই। কারণ সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আন্তরিক হলে বন্ধুকযুদ্ধের কোনো ঘটনাই ঘটত না। কাজেই সাময়িক সময়ের জন্য এ ঘটনা কমে যাওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ‘কৌশলগত পরিকল্পনা’রই অংশ। তবে সশস্ত্র অপরাধীরা চ্যালেঞ্জ করলে পাল্টা আঘাত ছাড়া কিছু করার থাকে না বলে দাবি করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। আইন প্রয়োগের এ অধিকার তাদের রয়েছে বলেও মনে করেন তারা।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে কথিত বন্দুকযুদ্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে মৃত্যু হয় ৩ হাজার ৯০৮ জনের। সেই হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২০ জনের মৃত্যু হয়েছে বিচারবহির্ভূত এ হত্যকা-ে। এর মধ্যে ২০১৯ সালেই প্রাণ হারান ৩৮৮ জন। ২০২০ সালে নিহত হন ১৭৬ জন। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ৪৬৬ জন। ২০১৭ সালে নিহত হন ১৬২ জন। ২০১৬ সালে নিহত হন ১৯৫ এবং ২০১৫ সালে ১৯২ জন। এ ছাড়া ২০১৪ সালে ১৫৪ জন, ২০১৩ সালে ২০৮ জন, ২০১২ সালে ৯১ জন, ২০১১ সালে ১০০ জন, ২০১০ সালে ১৩৩ জন নিহত হন। সিনহা হত্যাকা-ের পর ২০২০ সালে আগস্ট থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত- এই এক বছরে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ২৮ জন।

অবশ্য সিনহা হত্যাকা-ের কয়েক মাস পর মানবাধিকার কর্মীরা বলেছিলেন, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর সিনহাকে হত্যার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হওয়ায় সাময়িকভাবে কথিত বন্দুকযুদ্ধ বন্ধ রাখা হয়। দীর্ঘমেয়াদে যদিও এটি বন্দুকযুদ্ধের ওপর প্রভাব ফেলবে না, সিনহা হত্যাকা-ের ইস্যু থিতিয়ে এলেই ফের তা শুরু হবে। আলোচিত ঘটনাটির বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ধীরে ধীরে মানবাধিকার কর্মীদের সেই বক্তব্যের সত্যতা মিলতে শুরু করেছে। সিনহা হত্যাকা-ের পরের পাঁচ মাস আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা কমে পাঁচটিতে নেমে এলেও, পরের সাত মাসে আবার বাড়তে শুরু করেছে। এ সময় ২৩টি কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটেছে।

সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে সিলেটে। ঈদুল আজহার ছুটিকালীন ২০২০ সালের ২ আগস্ট জকিগঞ্জে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে নিহত হন আবদুল মান্নান ওরফে মুন্না (৩৫)। জকিগঞ্জ থানার ওসি মীর আবদুন নাসের তখন জানিয়েছিলেন, সুলতানপুর ইউনিয়নের খাদিমান গ্রামের বাসিন্দা মুন্নার নামে মাদক চোরাচালান, অস্ত্র, ডাকাতির প্রস্তুতি, বিস্ফোরকসহ ১২ মামলা রয়েছে। গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, তার বসতঘরে ইয়াবা ও অস্ত্র রয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে রাতে পুলিশ তাকে নিয়ে অভিযানে গেলে পথেই মুন্নার সঙ্গীরা পুলিশের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। তখন পুলিশও আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি করে। এ সময় গুলিবিদ্ধ মুন্নাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। ঘটনাস্থল থেকে একটি পাইপগান, ৫ রাউন্ড গুলি, ৬টি ধারালো দা ও ৮০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধারের দাবি করেছিল পুলিশ।

মানবাধিকার সংস্থা আসকের নির্বাহী কমিটির মহাসচিব নূর খান লিটন আমাদের সময়কে বলেন, ‘নীতিগতভাবে সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি এ জায়গা (বন্দুকযুদ্ধ) থেকে পিছিয়ে থাকে, তা হলে তো একটি ঘটনাও ঘটার কথা না। মূলত সিনহা হত্যাকা-ের ঘটনায় জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়। সে কারণে কৌশলগত অবস্থান নেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেগুলো ঘটেছে সেগুলোর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ, অর্থাৎ কমিশন গঠন করে যদি খতিয়ে দেখা হতো কী হয়েছিল, কারা করেছিল। তা হলে এমন একটি ঘটনাও আর ঘটত না। কিন্তু এ রকম কোনো পদক্ষেপ আমরা রাষ্ট্রের তরফ থেকে নিতে দেখিনি। কাজেই এ সংখ্যা দিয়ে বলার সুযোগ নেই যে, পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।’

কক্সবাজারের রামুতে গত ৩ মার্চ র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে দেলোয়ার হোসেন নামে এক মাদককারবারি নিহত হন। এ সময় তার কাছ থেকে প্রায় ৪ লাখ ইয়াবা, একটি পিস্তল, ৪ রাউন্ড গুলি ও একটি গুলির খোসা উদ্ধারের দাবি করে র‌্যাব। নিহত দেলোয়ার হোসেনের বাড়ি টেকনাফের উত্তর জালিয়াপাড়া এলাকায়। র‌্যাব জানায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যা ৭টার দিকে রামু রাবার বাগানের ভেতরে পাহাড়ের ঢালে ইয়াবা পাচার হচ্ছে এমন খবর পেয়ে সেখানে যায় র‌্যাব-৭ এর একটি দল। এ সময় র‌্যাবকে লক্ষ করে গুলি চালায় মাদককারবারিরা। পরে গোলাগুলি থেমে গেলে ঘটনাস্থল থেকে ইয়াবা, অস্ত্র ও দেলোয়ারের লাশ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে জানতে চাইলে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আমাদের সময়কে বলেন, ‘কোন সশস্ত্র ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি চ্যালেঞ্জ করে তখন সরকারি সম্পদ ও জানমাল রক্ষায় র‌্যাবকেও পাল্টা জবাব দিতে হয়। আগের চেয়ে মাদকবিরোধী অভিযান জোরদার রয়েছে। অভিযানের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনার (বন্দুকযুদ্ধ) কোনো সম্পর্ক নেই।’

গত ১৬ জুলাই কক্সবাজারের উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়নের নলবনিয়া এলাকায় বিজিবির সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে লুতফর রহমান লুতু নামে এক মাদককারবারি নিহত হন। এ সময় তার কাছ থেকে ৫০ হাজার পিস ইয়াবা ও ১টি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। বিজিবি জানায়, উখিয়াসহ বিভিন্ন থানায় তার নামে ১২টি মামলা রয়েছে।

গত ১ জুলাই রাতে টেকনাফ সদরের হাবির ছড়া এলাকার একাধিক মামলার পলাতক আসামি শামসুল আলমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। টেকনাফ থানা পুলিশ জানায়, তাকে থানায় নিয়ে আসার পথে মিঠাপানির ছড়া এলাকায় পৌঁছালে তার লোকজন অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ব্যারিকেড দিয়ে শামসুলকে ছিনিয়ে নিতে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশও আত্মরক্ষায় পাল্টা গুলি চালায়। দুই পক্ষের গোলাগুলিতে মাদক মামলার পলাতক আসামি খোরশেদ আলম গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায় পুলিশ। চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে নিয়ে আসার আগেই তার মৃত্যু হয়।

জানতে চাইলে কক্সবাজারের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. হাসানুজ্জামান আমাদের সময়কে বলেন, ‘এখানে এমন অপরাধী রয়েছেন যারা লোকাল অস্ত্র তৈরি করে ব্যবহার করছেন। যাদের কাটডাউন করার জন্য শক্তি প্রয়োগ করা দরকার হয় এমন ব্যক্তি এখানে আছে। এ কারণে অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এনকাউন্টারের মতো ঘটনা ঘটছে। আমাদের সঙ্গে এখনো ঘটেনি। কিন্তু অপরাধীদের সঙ্গে যদি সরাসরি এনকাউন্টার কখনো হয় সে ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটতেই পারে। আত্মরক্ষার্থে আইন এবং বিধিতে ক্ষমতা দেওয়া আছে সেটি তখন আমাদের প্রয়োগ করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সতর্ক রয়েছি। অপরাধীরাও তাদের কৌশলে পরিবর্তন এনেছে। আমি যোগদান করার পর এ ধরনে ঘটনা ঘটেনি। অভিযান কমেছে এটাও বলা যাবে না। বরং অভিযান জোরদার করেছি।’