জাতীয়

বেড়েছে মশার উপদ্রব, নগরবাসীর মনে গত মৌসুমের ভয়

(Last Updated On: মার্চ ৭, ২০২০)

গত ডেঙ্গু মৌসুমে (আগস্ট-নভেম্বর) মশার ভয়াবহতা রাজধানীবাসীর মধ্যে যে ভয় ঢুকিয়েছিল, তা এখনো কাটেনি বলা যায়। এর মধ্যে ফের রাজধানীতে বেড়ে গেছে মশার উপদ্রব। বাসাবাড়ি, দোকানপাট, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত সর্বত্রই মশার প্রকোপ দেখা যাচ্ছে। এতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে নগরজীবন। মশার এই উপদ্রব বেড়ে যাওয়ায় নগরবাসীকে তাড়া করছে গত ডেঙ্গু মৌসুমের ভয়।

জানা গেছে, গত মৌসুমে এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে কয়েক লাখ মানুষ চিকিৎসা নেন। গত ১০ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে, সরকারি হিসাবেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান ১৩৩ জন। ওই ভয়াবহতার কারণে সেই মৌসুমে মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে ব্যাপকভাবে তৎপর হয় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন।

কিন্তু গত ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে নগরের দুই ভাগেই মশার ওষুধ ছিটানোর কার্যক্রমে ধীরগতি দেখা যায়। সেজন্য জানুয়ারির শেষ দিক থেকে মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। আর এখন পরিস্থিতি আতঙ্কে রূপ নিয়েছে। ফলে নগরবাসী দিন পার করছেন গত মৌসুমের ভয়াবহতা ভেবে।

Dengue.jpg

গত মৌসুমে রাজধানীতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেন কয়েক লাখ মানুষ

বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এডিস মশার পাশাপাশি ইদানীং কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেড়ে গেছে ঢাকায়। কার্যকর পূর্ব প্রস্তুতি না নিতে পারলে আগামীতে পরিস্থিতি আরও মারাত্মক রূপ নিতে পারে। সেজন্য মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করতে হবে। যদিও এডিস ও কিউলেক্স মশা নিধনের পদ্ধতি ভিন্ন ধরনের। তবে আগামী দুই মাসের মধ্যে দুই সিটি করপোরেশন এক্ষেত্রে টেকসই কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে পারলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। নইলে আসছে মৌসুমে নগরবাসীর কপালে দুর্ভোগ আছে।

ডেঙ্গু পরিস্থিতির খানিকটা উন্নতির মধ্যে গত ১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি-ডিএসসিসি) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দুই সিটিতে মেয়র পদে জয়ী হন আওয়ামী লীগের দুই প্রার্থী যথাক্রমে আতিকুল ইসলাম ও শেখ ফজলে নূর তাপস। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়রসহ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলরদের শপথ পড়ানো হয়।

সেই শপথানুষ্ঠানে খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুই মেয়রসহ সংশ্লিষ্টদের মশা নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, ঢাকায় যারা নির্বাচিত হয়েছেন তারা মনোযোগ দিয়ে কাজ করবেন। মশার উপদ্রব কমাবেন। ক্ষুদ্র প্রাণী হলেও মশা কিন্তু খুব শক্তিশালী প্রাণী। মশাকে নিয়ন্ত্রণে রাখবেন। তা না হলে মশা কিন্তু আপনার ভোট খেয়ে ফেলবে।

মশার উপদ্রব সম্পর্কে রাজধানীর হাজারীবাগের বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, গত মৌসুমে ডেঙ্গু মারাত্মক রূপ নেয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতাকেই দায়ী করেছে রাজধানীবাসী। বছরব্যাপী মশক নিধন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি তখন এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না। ইদানীং মশার উপদ্রব আবারও বেড়ে গেছে। এতই বেড়েছে যে, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় মশা কামড়াচ্ছে। কোথাও শান্তি নেই। দিন নেই, রাত নেই সব সময়ই মশার উৎপাত।

Dengue.jpg

মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত ওষুধ না ছিটানোর অভিযোগ উঠেছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেরই বিরুদ্ধে

তিনি বলেন, সিটি করপোরেশন খুব বুলি আওড়াচ্ছে যে, তারা নাকি মশা নিয়ন্ত্রণে ব্যাপক উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগই আমরা দেখতে পাচ্ছিনা। আমাদের আশ-পাশের এলাকার কেউ বলতে পারবে না যে, তারা গত কিছুদিনের মধ্যে কোনো মশক নিধনকর্মীকে ওষুধ ছিটাতে দেখেছে। তাদের দেখাই পাওয়া যায় না। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর থেকে মশার উৎপাত এত বাড়ে যে মশারি ছাড়া টেকাই যায় না। কিন্তু মশারির মধ্যে আর কত সময় থাকা যায়? কর্তৃপক্ষের উচিত, নগরবাসী যেন গতবারের মতো না ভোগে, সেই ব্যবস্থা নেয়া।

শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা কাউছার আলী বলেন, মশার যন্ত্রণা আমরা বড়রা তাও কিছুটা সহ্য করতে পারলেও বাসায় ছোট বাচ্চারা এটা কীভাবে সহ্য করবে? মশা প্রতিদিন কামড়ে ছোট বাচ্চাদের হাত-পা-শরীর লাল করে ফুলিয়ে তুলছে। তাদের আর কতক্ষণ মশারির মধ্যে রাখা যায়। অ্যারোসল বা মশার কয়েল দিলে তাদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি হয়ে যায়। তাই বাচ্চাদের নিয়ে পড়েছি মহাভোগান্তিতে। আমরা সিটি করপোরেশনের বাসিন্দা, সিটি করপোরেশন তাহলে আমাদের জন্য কী পদক্ষেপ নিয়েছে? এভাবে আমরা আর কতোদিন সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে থাকবো?

বাড্ডার চা-দোকানী মকলেছুর রহমান বলেন, সন্ধ্যার পর থেকে ২-৩টা কয়েল একসাথে জ্বালাতে হয়। তবু মশার উৎপাত কমে না। আমিসহ সব কাস্টমারকে মশা ঘিরে ধরে। ইদানীং এতো মশা হয়েছে যে কেউ ৪-৫ মিনিটও স্থির হয়ে বসে থাকতে পারে না দোকানে। আর মশা মারার জন্য সিটি করপোরেশনের কোনো লোককেও দেখা যায় না। যে কারণে ঘরে-বাইরে সব জায়গাতেই মশার যন্ত্রণা পোহাতে হচ্ছে আমাদের।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাম্প্রতিক এক জরিপেও মশার উপদ্রবের উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১২ শতাংশ এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) ১০ শতাংশ এলাকায় এডিস মশার লার্ভার ঝুঁকিপূর্ণ উপস্থিতি রয়েছে।

মশার অত্যাচার বাড়লেও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগ বলছে, তারা এ বিষয়ে কাজ করছে।

সম্প্রতি ডিএনসিসির মশক নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত এক জরুরি সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ডিএনসিসির ওয়ার্ড পর্যায়ের মশক নিধন কার্যক্রম আগামী ৮ মার্চ থেকে ১১টি টিমের মাধ্যমে মনিটরিং করা হবে।

Dengue.jpg

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র শেখ ফজলে নূর তাপস

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আমরা এসেছি। আমাদের ওপর তাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। মশা নিয়ন্ত্রণে আমাদের সম্ভাব্য সব কিছু করতে হবে। আগামী এক মাসের মধ্যে আমরা মশকমুক্ত শহর দেখতে চাই। মশক নিধনকর্মীরা যেন ঠিক মতো কাজ করেন, এ জন্য তাদের তদারকি করতে হবে। অনেক মশক নিধনকর্মী ঠিক মতো কাজ করেন না। নিধনকর্মী, ওয়ার্ড সচিব, সহকারী স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা, কাউন্সিলর- সবাইকে জবাদিহি করতে হবে। মার্চ মাস শেষ হওয়ার আগেই মশা নিয়ন্ত্রণে আনতে চাই। যেসব বাড়িতে-স্থাপনায় মশার লার্ভা পাওয়া যাবে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে তাদের জেল-জরিমানা করা হবে।

ডিএনসিসি সূত্রে জানা গেছে, এডিস মশার উপদ্রব হ্রাসকল্পে বছরব্যাপী কার্যক্রম গ্রহণ করেছে তারা। যা জানুয়ারি মাস থেকেই চলমান। আর স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওই জরিপে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের যেসব ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে ডিএনসিসির ৫টি ওয়ার্ড পড়েছে। ওয়ার্ডগুলো হলো- ১, ১২, ১৬, ২০ এবং ৩১। ডিএনসিসির চলমান নিয়মিত কার্যক্রমের সাথে এ ৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধনে বিশেষ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।

অন্যদিকে ডিএসসিসি এলাকায় মশক নিধনে, এডিস মশার উৎস নির্মূলের লক্ষ্যে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে স্পেশাল ক্র্যাশ প্রোগ্রামের উদ্বোধন করেছেন সিটি করপোরেশনের সদ্যবিদায়ী মেয়র সাঈদ খোকন।

তিনি সেসময় বলেন, এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে এবং নিজ নিজ বসত-বাড়ি, আঙিনা ও এর আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আর নাগরিকদের এডিস মশার প্রকোপ থেকে রক্ষাকল্পে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে আমাদের পক্ষ থেকে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের ওই জরিপে ঝুঁকিপূর্ণ যে এলাকার কথা বলা হয়েছে, সেখানে ডিএসসিসির ৫, ৬, ১১, ১৭, ৩৭ এবং ৪২ নম্বর ওয়ার্ডও রয়েছে। এই ওয়ার্ডগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে করপোরেশনের মশক নিধনকর্মী ও পরিচ্ছন্ন পরিদর্শকদের প্রতিটি বাড়ি পরিদর্শন করে এডিস মশার লার্ভা ধ্বংসের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ডিএসসিসি সূত্রে আরও জানা গেছে, ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়াসহ মশাবাহিত বিভিন্ন রোগ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ ডিপার্টমেন্ট তৈরি করার জন্য একটি কৌশলপত্র প্রণয়ন করেছে ডিএসসিসি। সিঙ্গাপুরের আদলে রাজধানীতে কীভাবে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার বিস্তারিত তুলে ধরা কৌশলপত্রটির আলোকে একটি প্রকল্প গ্রহণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

ওই কৌশলপত্র অনুযায়ী যদি পদক্ষেপ নেয়া যায়, তাহলে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত সব ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Hits: 10